সম্পাদকীয়
একটি দেশের অর্থনীতি শুধু বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না। মানুষের রান্নাঘর, কৃষকের জমি, কারখানার চাকা এবং শহর-গ্রামের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ—এসবই অর্থনীতির প্রকৃত আয়না।
সেই আয়নায় আজ বারবার ভেসে উঠছে একটি শব্দ—সংকট।
তেল সংকট, বিদ্যুৎ সংকট, গ্যাস সংকট, সার সংকট—একটির পর একটি প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আর প্রতিটি সংকটের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নিচ্ছে একই সন্দেহ—এসব কি শুধুই স্বাভাবিক বাজার সংকট, নাকি কোথাও কোনো শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অদৃশ্য হাত কাজ করছে?
তেলের বাজারে সংকট তৈরি হলে দাম বাড়ে। দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাড়ে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম। অর্থাৎ একটি জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত মানুষের খাবারের টেবিলেও আঘাত করে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের প্রভাব আরও বিস্তৃত। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, ব্যবসার খরচ বাড়ে, কর্মসংস্থানে চাপ পড়ে। উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন, শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হন, শেষ পর্যন্ত ভোক্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
আর সার সংকট সরাসরি দেশের কৃষকের বুকের ওপর আঘাত করে।
কৃষক সময়মতো সার না পেলে শুধু একটি মৌসুম ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; তার সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের আয় এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা। সরকার যদি ভর্তুকি দিয়ে সার আমদানি করে, অথচ সেই সার কৃষকের হাতে পৌঁছানোর আগেই মধ্যস্বত্বভোগী বা অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে রাষ্ট্রের ভর্তুকির সুবিধা কৃষক নয়—অন্য কেউ ভোগ করে।
এখানেই সিন্ডিকেটের প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা অবশ্যই প্রমাণ ছাড়া কাউকে সিন্ডিকেটের সদস্য বলতে পারি না। কিন্তু বাজারে যদি বারবার একই ধরনের সংকট দেখা দেয়, সরবরাহ থাকার পরও পণ্যের প্রাপ্যতা কমে যায়, দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে এবং সংকটের সময় কিছু গোষ্ঠী অস্বাভাবিক মুনাফা করে—তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা।
কারণ বাজারে সংকট তৈরি করা যেমন অপরাধ, তেমনি সংকটের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করাও জনগণের প্রতি অন্যায়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সরকার কি প্রতিবার সংকট তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেবে, নাকি সংকট তৈরি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেবে?
আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় দেখা যায়, সমস্যা বড় হওয়ার পর অভিযান শুরু হয়। বাজারে দাম বাড়ার পর বাজার মনিটরিং হয়। সার নিয়ে কৃষকের অভিযোগ বাড়ার পর অভিযান হয়। জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার পর আমদানির সিদ্ধান্ত আসে।
কিন্তু একটি কার্যকর রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আগুন নেভানো নয়; আগুন যাতে না লাগে, সেই ব্যবস্থাও করা।
তেলের ক্ষেত্রে যদি আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকে, তাহলে বিকল্প সরবরাহকারী ও পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাসের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হবে। আর কৃষকের জন্য সার সরবরাহে প্রয়োজন স্বচ্ছ ডিলার ব্যবস্থা, ডিজিটাল নজরদারি এবং মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি।
কেবল কয়েকটি দোকানে অভিযান চালিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙা যায় না।
সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে সিন্ডিকেটের জন্ম দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
যেখানে অল্প কয়েকজন আমদানিকারক বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, সেখানে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। যেখানে সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য রয়েছে, সেখানে সরাসরি কৃষক ও ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে তথ্যের অস্বচ্ছতা রয়েছে, সেখানে বাজারের তথ্য জনগণের সামনে উন্মুক্ত করতে হবে।
সরকারের হাতে আইন আছে, প্রশাসন আছে, গোয়েন্দা সংস্থা আছে, বাজার তদারকি ব্যবস্থা আছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—সিন্ডিকেট এত শক্তিশালী হয় কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
কারণ সিন্ডিকেট যদি রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে সমস্যা শুধু বাজারে নেই; সমস্যা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যেও রয়েছে।
আমরা এমন একটি বাজার চাই না যেখানে ব্যবসায়ী মুনাফা করবে না। ব্যবসা অবশ্যই হবে, বিনিয়োগ হবে, উদ্যোক্তা তৈরি হবে। কিন্তু সেই মুনাফা হতে হবে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নয়।
রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসায়ীর সম্পর্ক হওয়া উচিত অংশীদারিত্বের—নির্ভরশীলতার নয়। আর জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক হওয়া উচিত সুরক্ষার—জিম্মি করার নয়।
আজ তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার—প্রতিটি খাত আমাদের সামনে একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
সংকট যদি বারবার ফিরে আসে, তাহলে শুধু সংকটের সমাধান নয়—সংকটের উৎস খুঁজতে হবে।
কেউ যদি পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ যদি সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে বাজার অস্থিতিশীল করে, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি অসাধু ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করেন, তাকেও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে।
কারণ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের লড়াই তখনই সফল হবে, যখন এই লড়াই হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।
আমরা বিশ্বাস করি—বাংলাদেশের কৃষক সার চাইলে সার পাবেন, মানুষ জ্বালানি চাইলে জ্বালানি পাবেন, শিল্প উদ্যোক্তা গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাবেন এবং ভোক্তা ন্যায্য দামে পণ্য পাবেন—এটাই একটি কার্যকর রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কিন্তু যদি প্রতিটি প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য মানুষকে কোনো না কোনো অদৃশ্য শক্তির মুখাপেক্ষী হতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—
রাষ্ট্র কি বাজার পরিচালনা করছে, নাকি বাজারের আড়ালে থাকা সিন্ডিকেট রাষ্ট্রকে পরিচালনা করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের নয়—সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
দৈনিক কাগজ কলম মনে করে, জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি বা বাজার কারসাজির সুযোগ থাকা উচিত নয়। সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার, স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
— আল আমিন মিলু
নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক কাগজ কলম
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ মশিউর রহমান
নির্বাহী সম্পাদকঃ আল আমিন মিলু
প্রধান কার্যালয়ঃ মিরপুর-১৩ রোড নং ০৭ বাসা নাম্বার ২২ ব্লক-সি ঢাকা ১২০৬
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ তারাকান্দি শিল্পাঞ্চাল, সরিষাবাড়ী,জামালপুর।
মেইলঃ moshiurnews93@gmail.com
মোবাইলঃ ০১৮৫০ ৭২২ ৯৭১/ ০১৭৪৫ ৭৪৫ ৭৩৩/০১৭১৯ ০৮৫ ৭১৬
Design & Development By HosterCube Ltd.