
সম্পাদকীয় | দৈনিক কাগজ কলম
গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, জ্বালানি তেলের সংকট—দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্নীতি, অনিয়ম ও জনজীবনের বহুমুখী দুর্ভোগ—এসব সংকটের অবসান এবং একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের প্রত্যাশাই মানুষকে জুলাইয়ের আন্দোলনের পথে নিয়ে গিয়েছিল। মানুষ রাজপথে নেমেছিল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য নয়; তারা চেয়েছিল জীবনের পরিবর্তন। চেয়েছিল এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিককে গ্যাসের জন্য লাইন, বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা কিংবা জ্বালানির জন্য হাহাকার করতে হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেই প্রত্যাশার কতটুকু পূরণ হয়েছে?
বাস্তবতার চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। সংকটের স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই সংকটের চরিত্র বদলেছে, কোথাও আবার তা আরও প্রকট হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর আলোচনা থাকলেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না; গ্যাসের ঘাটতি শিল্প, বিদ্যুৎ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করছে; জ্বালানি তেলের বাজারেও মূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য। ফলে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই—যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, সেই পরিবর্তনের সুফল কোথায়?
কোনো আন্দোলন কেবল সরকার পরিবর্তনের নাম নয়। একটি গণআন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। ক্ষমতার চেয়ারে মুখ বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না; রাষ্ট্র বদলায় যখন নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত হয়, সেবা সহজ হয়, বাজারে স্বস্তি ফিরে আসে এবং মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানের নামে যদি বারবার সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত ও দূর করা না হয়, তাহলে সমস্যা আরও গভীর হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা, বিদ্যুৎখাতের স্বচ্ছতা, অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ, সঠিক বিনিয়োগ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আমদানি, মজুত, বিতরণ ও মূল্য নির্ধারণের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। যে তরুণেরা, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিক পরিবর্তনের প্রত্যাশায় রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, তাদের কাছে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। তাদের প্রত্যাশার উত্তর দিতে হবে বক্তৃতায় নয়—বিদ্যুতের আলোয়, চুলার গ্যাসে, শিল্পের উৎপাদনে, সাশ্রয়ী জ্বালানিতে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
আজ তাই সবচেয়ে প্রয়োজন আত্মতুষ্টি নয়, আত্মসমালোচনা। কোথায় ব্যর্থতা, কেন ব্যর্থতা এবং কীভাবে সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা যায়—তা নিয়ে নির্মোহ পর্যালোচনা দরকার। জনগণ আর নতুন প্রতিশ্রুতির পাহাড় দেখতে চায় না; তারা চায় দৃশ্যমান পরিবর্তন।
জুলাই যদি হয়ে থাকে পরিবর্তনের অঙ্গীকার, তবে সেই অঙ্গীকারের প্রমাণ দিতে হবে মানুষের জীবনযাত্রায়।কারণ রাজপথের স্লোগান একদিন থেমে যায়, কিন্তু মানুষের সংকট প্রতিদিনের। আর সেই সংকটের সমাধানই হবে জুলাইয়ের প্রকৃত সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি।
আল আমিন মিলু
দৈনিক কাগজ কলম