
সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি সার। ধান, ভুট্টা, সবজি কিংবা অন্যান্য ফসল—কোনো ক্ষেত্রেই সারের যথাযথ সরবরাহ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সম্ভব নয়। অথচ মৌসুম এলেই সার নিয়ে সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, ডিলারদের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং কৃষকের দীর্ঘশ্বাস—এসব যেন আমাদের কৃষিব্যবস্থার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
এক বস্তা সারের দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি করলে ডিলারের বস্তাপ্রতি লাভ থাকে প্রায় ১০০ টাকা। কিন্তু এর সঙ্গে পরিবহন, লোড-আনলোড, গুদামজাতকরণসহ বিভিন্ন ব্যয় যুক্ত হলে স্থানভেদে বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়। ফলে প্রকৃত মুনাফা অনেক ক্ষেত্রে নেমে আসে মাত্র ১০ থেকে ৫০ টাকায়। কোথাও কোথাও সরকারি মূল্যে সার বিক্রি করে ডিলারকে লোকসানও গুনতে হয়।
সম্প্রতি বাফার ও বিএডিসির গুদাম থেকে সার ছাড়ের ক্ষেত্রেও বস্তাপ্রতি বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। কারণ সরকারি গুদাম থেকে শুরু করে ডিলার ও কৃষকের হাত পর্যন্ত সরবরাহের প্রতিটি স্তরে যদি অনানুষ্ঠানিক খরচ যুক্ত হয়, তার শেষ বোঝা গিয়ে পড়ে কৃষকের ঘাড়ে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের সার নীতিমালায় খুচরা সার বিক্রেতাদের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা, পরবর্তীতে বারবার মেয়াদ বাড়ানো, বিগত বছরের তুলনায় চলতি বছরে কোনো কোনো এলাকায় বরাদ্দ কমে যাওয়া এবং বাজারে পর্যাপ্ত আমদানি নেই—এমন নানা গুজবও সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সরবরাহে সামান্য ঘাটতি দেখা দিলেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে আতঙ্ক ছড়ানোর সুযোগ নেয়।
সংকটের মূল কারণ কোথায়?
সার সংকটকে শুধু ডিলারদের কারসাজি হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ বের হবে না। এর পেছনে রয়েছে সরবরাহ ও বরাদ্দ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয়, ডিলারদের অপ্রতুল মুনাফা, কোথাও কোথাও গুদাম পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ না পাওয়া এবং বাজারে সরবরাহ নিয়ে নানা ধরনের গুজব।
একই সঙ্গে সার বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগী ও অস্পষ্টতা থাকলে প্রকৃত কৃষকের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই প্রয়োজন সমস্যার গোড়ায় হাত দেওয়া।
প্রতি ওয়ার্ডে একজন মূল ডিলার নিয়োগ
সার বিতরণে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে অনুমোদিত মূল ডিলার নিয়োগ করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের আবাদি জমির পরিমাণ, কৃষকের সংখ্যা ও ফসলের ধরন বিবেচনা করে ওই ডিলারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ সার বরাদ্দ দিতে হবে।
অর্থাৎ নীতি হতে পারে—
“এক ওয়ার্ড—এক মূল ডিলার—নির্ধারিত বরাদ্দ—স্বচ্ছ হিসাব।”
এ ব্যবস্থায় একজন ডিলার তার নির্ধারিত ওয়ার্ডের কৃষকদের কাছে সরকারি মূল্যে সার বিক্রি করবেন। ফলে কোন ওয়ার্ডে কত সার বরাদ্দ হয়েছে, কত সার গুদামে এসেছে, কত সার বিক্রি হয়েছে এবং কত সার অবশিষ্ট রয়েছে—সবকিছুর একটি পরিষ্কার হিসাব রাখা সম্ভব হবে।
কৃষকও জানবেন, তার এলাকার সার কোথা থেকে কিনতে হবে। সার পাওয়ার জন্য এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছুটতে হবে না। একই সঙ্গে একাধিক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগও কমে আসবে।
তবে একজন মূল ডিলারকে জবাবদিহির বাইরে রাখা যাবে না। তার জন্য ডিজিটাল মজুত ও বিক্রয় রেজিস্টার, বাধ্যতামূলক বিক্রয় রসিদ, দোকানে সরকারি মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং নিয়মিত কৃষি কর্মকর্তাদের নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
কোনো ডিলার সরকারি মূল্যের অতিরিক্ত টাকা নিলে, সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে কিংবা নির্ধারিত কৃষককে সার না দিয়ে অন্যত্র বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
ডিলারকে যৌক্তিক মুনাফা দিতে হবে
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। একজন ডিলারকে যদি পরিবহন, শ্রমিক, গুদাম, লোড-আনলোডসহ সব খরচ বহন করতে হয়, অথচ বস্তাপ্রতি লাভ থাকে মাত্র ১০০ টাকা, তাহলে তার পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে সৎভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে।
তাই সরকারকে ডিলারদের প্রকৃত ব্যয় পর্যালোচনা করে বস্তাপ্রতি মার্জিন ১০০ টাকার পরিবর্তে ২০০ টাকা পর্যন্ত যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
তবে এর বিনিময়ে একটি কঠোর শর্ত থাকতে হবে—সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে কৃষকের কাছ থেকে এক টাকাও অতিরিক্ত নেওয়া যাবে না।
সরকার যদি ডিলারের বৈধ মুনাফা নিশ্চিত করে, তাহলে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অজুহাতও অনেকটাই দূর হবে। অর্থাৎ ডিলারের স্বার্থ ও কৃষকের স্বার্থকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, বরং দুটিকেই সমন্বয় করেই সমাধান খুঁজতে হবে।
গুদাম থেকে কৃষকের হাত পর্যন্ত নজরদারি
সারের সংকট বন্ধ করতে হলে শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে লাভ হবে না। বাফার ও বিএডিসির গুদাম থেকে শুরু করে ওয়ার্ডের মূল ডিলার এবং শেষ পর্যন্ত কৃষকের হাত পর্যন্ত পুরো সরবরাহ চেইনকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
কত সার গুদামে ঢুকল, কত সার কোন ডিলারকে দেওয়া হলো, ডিলার কত সার বিক্রি করলেন—প্রতিটি তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
প্রতিটি বস্তার সঙ্গে ব্যাচ নম্বর বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে সার কোথা থেকে কোথায় গেল, সেটিও সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
কৃষকের হাতে রসিদ, সরকারি মূল্য দৃশ্যমান
প্রতিটি সার বিক্রির ক্ষেত্রে কৃষককে রসিদ দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। দোকানে বড় অক্ষরে সরকারি মূল্য প্রদর্শন করতে হবে।
কৃষক যেন জানেন—
“এই সারের সরকারি দাম কত, ডিলারের বৈধ লাভ কত এবং পরিবহনসহ অতিরিক্ত কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ আছে কি না।”
একটি কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কৃষক মোবাইল ফোনে অভিযোগ করতে পারবেন এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বরাদ্দ নির্ধারণেও পরিবর্তন প্রয়োজন
কোনো এলাকার সার বরাদ্দ নির্ধারণের সময় শুধু আগের বছরের বরাদ্দকে ভিত্তি করলে চলবে না। ওই এলাকার বর্তমান আবাদি জমি, ফসলের ধরন, মৌসুমি চাহিদা ও কৃষকের সংখ্যা বিবেচনায় নিতে হবে।
চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ দিলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই সংকট তৈরি হবে। আর সেই সংকটকে পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাড়তি দাম নেওয়ার সুযোগ পাবে।
তাই চাহিদাভিত্তিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি।
গুজব নয়, চাই সরকারি তথ্য
বাজারে ‘সার নেই’, ‘আমদানি বন্ধ’, ‘আগামী মাসে দাম বাড়বে’—এ ধরনের গুজব কৃষকের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সরকারকে নিয়মিতভাবে দেশের সার মজুত, আমদানি, সরবরাহ ও ভবিষ্যৎ বরাদ্দের তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
তথ্যের স্বচ্ছতা থাকলে গুজবের বাজার দুর্বল হবে।
শেষ কথা
সার কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়। এটি দেশের খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই সার নিয়ে সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু কৃষকের জমিতে পড়ে না—পুরো অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর পড়ে।
সরকারি দামে সার নিশ্চিত করতে হলে ডিলারকে লোকসানে রেখে দেওয়া যাবে না। আবার ডিলারের লাভের নামে কৃষকের কাছ থেকেও বাড়তি টাকা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা—
প্রতি ওয়ার্ডে একজন মূল ডিলার,
ডিলারের জন্য যৌক্তিক মুনাফা,
কৃষকের জন্য নির্ধারিত মূল্য,
চাহিদাভিত্তিক বরাদ্দ,
ডিজিটাল মজুত ও বিক্রয় হিসাব,
গুদাম থেকে কৃষকের হাত পর্যন্ত নজরদারি,
এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা।
সার সংকটের স্থায়ী সমাধান অভিযাননির্ভর নয়; এটি হতে হবে পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিনির্ভর।
কৃষককে সার কিনতে গিয়ে যদি বাড়তি টাকা দিতে হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয় কিংবা এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরতে হয়—তাহলে কৃষিবান্ধব নীতির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।
কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে।
কৃষি বাঁচলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বাঁচবে।
তাই সার সংকটের সমাধান এখন আর শুধু কৃষকের দাবি নয়—এটি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন।
আল আমিন মিলু
নির্বাহী সম্পাদক